মোরা একবৃন্তে দুটি কুসুম

কলমে: কুমকুম

পর্ব: ১
আমি পুরুলিয়া জেলার প্রত্যন্ত গ্ৰামের ছেলে সুজন। বাবা দীনবন্ধু চৌধুরী গ্ৰামের পোস্টমাস্টার। ছোটো থেকে বাবা-মা, ঠাকুমা-ঠাকুরদা, কাকা-কাকি আর দুই ছোটো ছোটো খুরতোত ভাই-বোন বাবলু আর মিনুর সাথে যৌথ পরিবারে মানুষ হয়েছি। আমার পরিবারের প্রতিটি মেয়েমানুষ বড্ড গোঢ়া প্রকৃতির। বিশেষত মুসলিমদের প্রতি একটু আলাদা চিন্তাধারা বহন করে সবাই। কেন যে তাদের প্রতি এই পরিবারের এমন বিদ্বেষ তা আজও আমার অজানা। কোনো সুত্রে যে তাদের সাথে এবাড়ির কোনো শত্রুতা ছিলো এমনটাও নয়। তবু যে কেন সবার এমন মনোভাবাপন্ন তার উত্তর আমি আজও খুঁজে পায়নি।

এমনটা যে শুধু এবাড়ির লোকের মনোভাব তা সম্পূর্ণ ভুল। এ বাড়ি ছাড়াও আশেপাশে হিন্দু বাড়ি গুলোতেও শুধু আশেপাশেই বা কেন বলছি প্রায় পুরো গ্ৰামের একাধিক পরিবারেই ইসলাম ধর্মালম্বী মানুষের প্রতি এমন অদ্ভুত মনোভাব।

হিন্দু মুসলিম মিলিয়ে প্রায় ১৪৫টি পরিবার এই গ্ৰামে। যদিও হিন্দু মুসলমানদের পাড়া আলাদা আলাদা। কেবল পাড়াই না, তাদের বাজার, মসজিদ, মাদ্রাসা সবটাই হিন্দুদের পাড়া, বাজার, মন্দির, স্কুল পাঠশালা সব থেকে বেশ কিছুটা ব্যবধানে।

আমার বেশ মনে আছে, একবার তো জাত গেলো জাত গেলো রব পড়ে গিয়েছিলো এ বাড়িতে। আমি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি। এক বর্ষার দিনে স্যারের বাড়ি থেকে ফেরার সময় দেখি ভারী বর্ষার দরুন রাস্তায় অনেক জল জমেছিলো। আমি অগত্যা রাস্তা বদলে পাশের মুসলিম পাড়াদিয়ে বাড়ি ফিরি। বাড়ির সদর দরজা দিয়ে ঢুঁকতে ঢুঁকতে মাকে রাস্তার অভিজ্ঞতা বলায়, মা তীব্র স্বরে:

– ওখানেই দাড়া। আর ভিতরে ঢুঁকিসনে।

– আমি তো পুরো হতবাক। তাহলে কি এ বৃষ্টিতে এমন ভাবে ভিজব না কি ? জিজ্ঞেস করলাম।

– কাকি বারান্দায় দাঁড়িয়ে বললেন: হ্যা গো, তা তোমার মাথাখানা পুরো গিয়াছে না কি গো সুজন ? হিন্দু বামনের ছেলে হইয়া তুমি কি না মুসলিম পাড়া দিয়া এলৈ গো বাবা ? ছ্যাঁ ছ্যাঁ জাত ধম্মো বলিয়া কিছুই রইল না আর।

– সব কথা ঠাকুমার কানে যেতেই ঘর থেকে বেড়িয়ে এলেন। মায়ের ঊদ্দেশ্যে বললেন, বড়ো বৌ যাও গে, গঙ্গাজলে তোমার পোলারে শুদ্ধ করিয়া দাও। আমি বিকেলে ঠাকুরবাড়ী যাইব ওর দোষ কাটাতে হইবে।

– আমি তখনো ঠাঁয় উঠানে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজছিলাম। কোন দোষ যে আমি করেছি? আর ঠাকুমা কোন দোষ কাটানোর কথা যে বলছিলেন, তা কিছুই বুঝে ঊঠতে পারিনি।

– ঠাকুমার কথা অনুযায়ী মা গঙ্গা জলে আমায় শুদ্ধ করে, এক বালতি জল আর একটা গামছা রেখে বললেন, আমারে, ছুবিনে। বালতির জলে স্নান করিয়া এই গামছাখান গায়ে জড়িয়া দাওয়ায় উঠিয়া আয়।

আমি মায়ের কথা মতো তাই করলাম। স্নান সেরে বারান্দায় উঠে এলাম। খেয়াল করলাম মা গোবর দিয়ে উঠানে, যেখানে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম সেই জায়গাটা ধূয়ে দিলো আর আমার ব্যবহার করা বালতি, জামা-কাপড় সব ফেলে দিয়ে হরি নাম জব করতে করতে পুকুরের দিকে গেলো স্নানের জন্য।
*******

পর্ব: ২
দেখতে দেখতে এভাবেই এই গ্ৰামে বড়ো হয়ে উঠলাম ধীরে ধীরে। বাবা আর কাকাকে বাইরে সাবলিল ভাবে জাতি ধর্ম নির্ভিশেষে সবার সাথে কথা বলতে দেখেছি। কিন্তু এ বাড়ির মেয়েদের এমন মনোভাব ভাঙার কথা কারুর মাথায় আসেনি। আমিও এই পরিবারের পুরুষ সদস্য হয়ে বাবা কাকার পথেই চলেছি। হিন্দু মুসলীম এই দুই বর্ণের মধ্যে কেন যে এত দুরত্ব সে সব নিয়ে আর এতো মাথা ঘামায়নি কোনোদিন। এ সবের থেকে পড়াশোনায় মন দিলে বেশী ভালো হবে এমনটাই মনে হয়েছিলো।

স্কুলের গন্ডি পার করি ভালো রেজাল্ট নিয়ে। তারপর কলকাতায় চলে আসি। কলেজে ভর্তী হলাম। প্রথম প্রথম শহরের আদব কায়দা গুলো ঠিক মতো মানিয়ে নিতে খুব অসুবিধা হতো। ধীরে ধীরে সব কিছুর সাথে সরগর হতে একটা বছর কেটে গেলো।

আমি তখন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। কলেজের রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে আমার বর্তমান স্ত্রীর সাবিনার নজরুল সঙ্গীত শুনে আমি প্রেমে পরেছিলাম। ও তখন ছিলো প্রথম বর্ষের ছাত্রী। ওর নাম শুনে প্রথমে মনটা ভারাক্রান্ত হলেও ওর রূপের ঝলক, সুরেলা গলা আর মিষ্টি ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে আস্তে আস্তে প্রেমের স্রোতে বাহিত হতে বেশী সময় লাগেনি আমার।

ঐ অনুষ্ঠানের পর ধীরে ধীরে আমার আর সাবিনার সম্পর্ক গভীর হতে শুরু হলো। ওর বাড়ির সকলেই আমাকে এবং আমাদের এই সম্পর্কটাকে মেনে নেন। ওদের বাড়িতে আমার যাওয়া-আসা, খাওয়া-দেওয়া দিনে দিনে বাড়তে লাগলো। সহজেই ওনাদের সঙ্গে মিশে গেলাম আমি। জাত-পাতের বিভেদ বলে কিছু হয় বলে আদেও কোনো দিন মনে আসেনি। আসলে কলকাতায় বাঙালীদের দূর্গা পুজোই বলো আর মুসলীমদের ঈদ্ ই বলো আবার খ্রীষ্টানদের ক্রিশমাসেও সকলেই জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে উৎসব পালন করে থাকে।

আমি প্রায় ভুলতেই বসে ছিলাম যে আমার আর সাবিনার ভালোবাসার মধ্যেও একটি কাঁটা আছে, তা হলো আমাদের ধর্ম। আর এই কাঁটার কথা মনে করিয়ে দিলো আমার মা-কাকিমা।

কলেজ পার হয়ে বছর খানেক ঘুরতেই আমি কলকাতার এক ব্যাঙ্কে চাকরি পেয়ে গেলাম। মাসে একবার গ্ৰামের বাড়ি যেতাম বাবা-মার প্রতি ছেলের দায়ীত্ব পালন করতে। এরই মধ্যে ঠাকুমা-ঠাকুরদা গত হয়েছেন। কাকু-কাকিমা আর আমাদের হাঁড়ী আলাদা হয়ে গেছে। মিনুর বিয়ে হয়েছে পাশের গ্ৰামে, সেও এখন এক ছেলের মা। আর বাবলু দিল্লীতে এক বড়ো বেসরকারী অফিসে চাকরি করে। অফিস থেকে গাড়ি, বাড়ি সব কিছু পেয়ে গ্ৰামের নামও ভুলতে বসেছে এখন সে। সম্পর্ক বলতে মাসিক কিছু টাকা ম্যানি অর্ডার করে দিয়ে নিজেকে দায়মুক্ত করে।

চৈত্রমাসের এক রবিবার দুপুরের কথা। গ্ৰামে ইলেকট্রিক ক্যারেন্ট থাকলেও প্রায় সময় বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সেদিন ও ক্যারেন্ট চলে যাওয়ায় মা আমাকে আর বাবাকে খেতে দিয়ে হাতপাখা দিয়ে হাওয়া করছিলো।

আমি এমন একটা সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলাম। বাবা-মাকে একসাথে পেয়ে আমার আর সাবিনার সম্পর্কের কথাটা জানাই। ওকে বিয়ে করতে চাওয়ায় মূহুর্তের মধ্যে আমাদের সকলের উপর দিয়ে যে ঝড় সেদিন বয়ে গিয়েছিলো তা ভাষায় ব্যক্ত করার ক্ষমতা আমার নেই।
******

পর্ব: ৩
বাবা-মা এ সম্পর্ক কোনোদিন মেনে নিতে পারবে না এটা জানিয়ে দিলে সেই বিকেলেই আমি বাড়ি ছেড়ে চলে আসি কলকাতায়।

-আসার আগে মা কেঁদে কেঁদে বলতে থাকে,
ওরে খোকা যাইসনে। ওই মাইয়ারে বিয়া করিলে আমাদের সক্কলের জাত যাবে।

-আমি বললাম,
তোমার জাত কি এতোই ঠুনকো মা? যে কথায় কথায় চলে যায়।

-ওসব শহুরে কথা কইসনা খোকা। শহরে কি কোনো হিন্দু মাইয়া নাই? যে তুই একখান বেজাতের মাইয়ারে বিয়া করিতে চাইস?

আমি বার বার মা কে বোঝাতে চাইলাম, সাবিনার মতো এমন মিষ্টি মেয়ে সূর্যের আলোর মতো। ওর রূপের, গুনের প্রবিত্রতা জাত পাতের গন্ডি ছাড়িয়ে ঘরের লক্ষী হবার ক্ষমতা রাখে।

-বাবা প্রতুত্তরে বলে ছিলেন,
ওই সব কথা বইয়ের পাতা থেকে সাহিত্য চর্চা করতে ভালো লাগে। বাস্তবে হিন্দু মুসলমানের কোনো মিল হতে পারে না।

-গল্পতো আর এমনি হয় না বাবা। আমি বললাম। বাস্তব ঘটনাকে অবলম্বন করেই গল্প তৈরী হয়।

-আরো বলে চললাম,
অসুবিধাটা কোথায় তোমাদের? আমার বন্ধু শৈবাল সেও তো নার্গিসকে বিয়ে করে সুখে সংসার করছেন। ওদের পরিবারে তো এমন কেউ বাঁধ সাধেনি তোমাদের মতো!

-মা বললো,
এমন কইতে নাই পাপ হয়রে খোকা আমার। সোনা আমাগো কথা শোন। আমরা তোর মা-বাবা।

-বাবা পাশ থেকে বলেন,
তোমার ভালোই চাই আমরা। তাই ওসব প্রেমের ভুত মাথা দিয়ে নামাও। মন দিয়ে চাকরি খানা করে যাও। সময় হলে একখান ভালো মেয়ে দেখে তোমার বিয়ে দেবো ক্ষন।

ঝামেলা শুনে কাকিমা এসে উপস্থিত হন। ধূনোয় ধোয়া দেওয়ার মতো দাঁতে জিভ কেটে বলতে থাকেন,
– ও মা গো! এ কোন অলক্ষনে কথা কইছো গো সুজন? এমনটা মনে আনিলেও পাপ হইবে।

– এ পাপের কথা আপনার কোন শাস্ত্রে লেখা আছে শুনি কাকিমা?

রাগ আর ধরে রাখতে পারলাম না। মাথায় যেন আগুন জ্বলছিলো। স্পষ্ট জানিয়ে দিলাম, আমি বিয়ে করলে কেবল সাবিনাকেই করবো। নছেৎ এ জন্মে আর বিয়েই করবো না।

-মা ও রেগে বলে,
অজাত কুজাতের মাইয়ারে বিয়া করিবার চাইয়া সারা জম্ম কুয়ারা হইয়া থাকস। তবে এ বংশ জাত খুয়াইবার হাত থাইকে বাঁচিবে।

প্রায় এক ঘন্টা চলে আমাদের কথোপকথন। বার বার বোঝানোর চেষ্টা করে শেষমেষ ব্যর্থ হয়ে আমি বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যাই আর সোজা চলে আসি স্টেশনে।
জাত-পাতে বৈষম্যের বেড়া জাল কলকাতার মতো শহুরে এলাকায় ভাঙতে শুরু হলেও গ্ৰাম অঞ্চলে মুসলমান মেয়েকে বিয়ে করা তো দূরের কথা। ওদের কথা মনে আনাও পাপ বলে ধরা হতো।
*****

পর্ব: ৪
কলকাতায় ফিরে প্রায় দুদিন কারুর সাথে কোনো যোগাযোগ রাখলাম না। এমনকি সাবিনার সাথেও আর কোনো কথা বললাম না। এই দুদিন ঘরে নিজেকে বন্দী অবস্থায় রেখে দিলাম।আর ভাবতে লাগলাম, আমার কি করণীয় সেই মূহুর্তে।

দুদিন পর মাথা ঠান্ডা হলে, সাবিনাকে ফোনে বিকেল ৫টায় দেশপ্রিয় পার্কে পূর্ব পরিচিত জায়গায় আসার কথা জানালাম।

আমি অনেক আগেই পার্ক পৌছে সাবিনার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। ঠিক বিকেল ৫টা নাগাত সাবিনাকে একটা সাদা সালোয়ার-কামিজ পরে পার্কের গেট দিয়ে ঢুকতে দেখলাম। গায়ে লাল বাঁদনি প্রিন্টের ওড়নায় ওকে ঠিক ডানাকাটা পরীর মতো লাগছিলো।

-শান্ত ভাবে আমার পাশে বসতেই একটি ভারী মিষ্টি হাসির সাথে জিজ্ঞাসা করলো,
কি হয়ছে সুজন তোমার? আমার উপর রাগ করেছো বুঝি? আরো বললো, এমন কি ভুল করলাম যে পুরো দুদিন আমার ফোনটাও ধরলে না যে?

আমি কোনো উত্তর দিলাম না। সাবিনার কথায় চোখের জলে চারিপাশটা ঝাপসা লাগলো। কিছুক্ষন আমরা দুজনেই চুপ থাকার পর আমি কথা শুরু করলাম,
-সাবিনা! তুমি জানো আজ কেন তোমায় এখানে ডেকে পাঠিয়েছি?

-না তা ঠিক জানি না, কিন্তু এ আর নতুন কি? আমরাতো প্রায়ই এখানে আসি একান্তে নিজেদের মতো করে সময় কাটাবো বলে। ভালোবাসার এই সাড়ে তিন বছরে আমাদের কতো স্মৃতিই না জড়িয়ে আছে এই পার্কে বলো?

-আবার কিছুক্ষন চুপ থেকে আমি বললাম,
তোমায় একটা কথা জানানোর আছে। আর কথাটা বললো বলেই তোমায় আজ এখানে আসতে বলেছি।

-শান্ত ভাবে সাবিনা,
হ্যাঁ! বলো কি জানাতে আমায় ডেকেছো?

-সাবিনা! শোনো আমি আমার মা-বাবাকে আমাদের সম্পর্কের কথা জানিয়েছি। কিন্তু ওনারা কোনো মতেই তোমাকে বাড়ির বৌ হিসাবে মেনে নিতে পারবেন না।

দেখলাম, সাবিনা একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কথাগুলো শুনে চকিত হয়েছে বলে মনে হলো না। ওর মায়াভরা মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে না পেরে আমি মাথাটা নীচু করে বসে রইলাম।
চারপাশে সন্ধ্যে নেমে আসছে। পার্কের লাইট গুলো জ্বলে উঠেছে। কিছুক্ষন পর স্তবদ্ধতা ভঙ্গ করে সাবিনা বললো,
-জানো সুজন! আমি তোমার কথায় একটুও কষ্ট পাইনি। সত্যি বলছি। বিশ্বাস করো।

-ওর চোখ দুটো ছলছল করছে। আবারও বলতে লাগলো,
আমি জানতাম গ্ৰামের পরিবেশে হিন্দু-মুসলিমের বৈষম্য অনেক। তাই মনে মনে আমি প্রস্তুত ছিলাম, যে তোমার বাড়ির লোক আমায় মেনে নেবে না কোনোদিন। তবে…..

-তবে কি?

-তবে ….আমার আমাদের ভালোবাসার প্রতি অনেক বিশ্বাস। তাই আমি জানি তুমি কোনোদিনও আমায় ছেড়ে যাবেনা।

-কিন্তু! আমি যে……

-আমায় চুপ করিয়ে ও আবার বলতে লাগলো,
জানি। মা-বাবাকে একদম কষ্ট দিতে চাওনা। কি তাই তো? ঠিক বললাম কি?

আমি আর চোখের জল ধরে রাখতে পারলাম না। সাবিনার হাত দুটো নিজের মুঠোয় নিয়ে,
আমায় তুমি ক্ষমা করো সাবিনা। আমার খুব অসহায় মনে হচ্ছে নিজেকে। কি যে করি? কিছুই বুঝতে পারছি না আমি।

সাবিনা আমার মুঠো থেকে ওর হাত দুটো সরিয়ে আমার চোখের জল মোছাতে মোছাতে,
আরে পাগল। তুমি যা করেছো ঠিক করেছো। মা-বাবা তো সবার আগে। সাবিনা কেনো পৃথিবীর কোনো মেয়ের স্থানই বাবা-মার আগে হয়না গো। এটা আমি জানি।…..

*****

পর্ব: ৫
মাঝে আরো সাতটা বছর কেটে গেছে। কলকাতার একটা টু-রুমস ফ্লাটে আমি, আমার স্ত্রী সাবিনা আর আমাদের তিন বছরের ছেলে জুবিন মিলে সুখের সংসার পেতেছি।

সেইদিন সন্ধ্যে বেলায় সাবিনার সাথে দেখা করে ফেরার সময় দেখা হয় দীপেন স্যারের, মানে আমাদের বাংলা প্রোফেসরের সাথে। আমি ওনাকে সম্পূর্ণ ব্যাপারটা খুলে বলায় ঊনি পরামর্শ দিয়ে বলেন,
-“বাবা সুজন! একটা কথা বলি শোনো, তোমার মতো করে যদি রামমোহন মহাশয় কিংবা বিদ্যাসাগর সকলের কথা শুনতেন, তবে কি আজও সতীদাহ বা বাল্য বিবাহ এ সমাজ থেকে নির্মূল হতো?”…… “ভগবান তোমার হাত ধরে জাত-পাতের এই বৈষম্য দূর করার কথা যদি ভেবে থাকেন, তা হলে তোমার কি করণীয়?”….. একটু ভেবে দেখো বাবা।

তারপর আর কিছু ভাবতে হয়নি। যদিও বাবা-মাকে বারবার ডাকা সত্ত্বেও ওনারা আমাদের মেনে নেননি। সাবিনা এখনো প্রায় বলে ওর এই সংসার শ্বশুর-শ্বাশুরি ছাড়া অপূর্ণ।

এমন ভাবেই চলতে লাগলো আমাদের জীবন। অনেক সুখ ছিলো কিন্তু বাবা-মার অভাবটা সব সময় অনুভব করতাম আমরা।

দিনটা ছিলো জুবিনের জন্মদিন। অফিস থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে ঠিক করলাম রাতের খাবারটা একটা রেস্তরায় করবো। তাই বেড়িয়ে পরলাম সময় মতো।

গাড়িটা কলকাতার এক নামকরা রেস্তরার সামনে পার্ক করিয়ে ভিতরে যাবার সময় খেয়াল করলাম দুজন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা বসে ভিক্ষা চাইছেন। সামনে এগিয়ে আসতেই আমি চমকে উঠলাম।

-এ কি! আমি ঠিক দেখছি? নাকি এ চোখের ভুল।

আমার পা দুটো কাঁপছে। মনে বল এনে ঐ বৃদ্ধের গায়ে হাত দিতেই আমি কান্নায় লুটিয়ে পড়লাম। তোমরা এখানে বাবা? এই ভাবে? কিভাবে হলো এসব মা?

বাবা-মার ও চোখের জল বাঁধ মানছে না। বাবা বললো,
-সুজন! খোকারে আমরা তোকেই খুজতে এসেছি কলকাতায়।
-আমায় ফোনতো করতে পারতে একবার বাবা।
-নম্বরটা তো হারিয়ে গেছেরে খোকা। বাবা জানালেন।

-বাবার মুখে খোকা ডাকটা বহুদিন পরে শুনলাম। তবে গ্ৰামের বাড়ি-জমি? আর আমি যে প্রতি মাসে মানি অর্ডার করি? এমন অবস্থার কারণ?….. হাজারও প্রশ্ন ভীড় করে এলো আমার মনে।

দূরে দাঁড়িয়ে সবটা শুনছিলো সাবিনা। দু পা এগিয়ে এসে আমার ঊদ্দেশ্যে,
আচ্ছা শোনো এমন করো না। বাবা-মা কে নিয়ে বাড়ি যাই চলো। তারপর না হয়…… এখন এসব কথা থাক না সুজন।

আমি হাতের ঈশারায় বললাম,
-বাবা মা দেখো এই তোমাদের নাতি। জুবিন হতবাক হয়ে তিন-চার পা দূরে ওর মায়ের সাথে দাঁড়িয়ে ছিলো।

মা কাঁদতে কাঁদতে হাত দুটো তুলে ওকে ডাকতেই, সাবিনা জুবিনকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
-সোনাই, যাও। ওনারা হলেন তোমার দাদা-দাদি।

জুবিন এগিয়ে এলে, মা ওকে জড়িয়ে,
-এ যে! আমাগো চাঁদের মানিক। আমাগো খোকার একমাত্র পোলা।

আমি চোখের জল মুছে উঠে দাঁড়ালাম। রেস্তরা থেকে খাবার পার্সেল করিয়ে নিলাম, বাড়িতে ফিরে মায়ের হাতে খাবো বলে।

গাড়িতে ফেরার সময় বাবার থেকে জানলাম, মাস ছয়েক আগে কাকা মারা যাওয়ায় বাবলু সমস্ত কিছু নিজের নামে করিয়ে নিয়ে বাবা-মাকে বাড়ি থেকে বার করে দেয়। সেই থেকেই মা-বাবা আমার খোজে কলকাতায়।

রাতে খাওয়ার পর বাবা-মা তাদের চাঁদের মানিককে নিয়ে শুতে গেলো। আমিও শোয়ার ঘরে এসে দেখলাম,
সাবিনা, মনের আনন্দে গুন গুন করছে, ‘মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান।’ পরিপূর্ণ সংসারের সুখ আজ ওর চোখ দুটোতে স্পষ্ট।

পোষ্টটি কেমন লাগল?

মতামত দিতে আপনাকে অবশ্যই লগিন থাকতে হবে।

গড় মান 0 / 5. মোট মতামত 0

আপনিই প্রথম মতামত দিন।

আপনার ভালো লাগেনি শুনে দুঃখিত!

কিভাবে উন্নতি করা যায়?

কিভাবে আরও উন্নত করা যায়, সে সমন্ধে আপনার মতামত দিন।

মুক্তাঙ্গন

Author: মুক্তাঙ্গন

চিন্তা হোক উন্মুক্ত...

Leave a Reply