সর্ষে ফুল ( এ কোয়ারেনটাইন মোমেন্ট )

লেখক : সামীর সেখ

এখানে ঢালাই করা সিমেন্টের মাঝারি টাইপ উঠান বেশ কিছু ফুল গাছ লাগানো আছে উঠানে, হাঁটা চলা করার যায়গায় পারাগরেনু ছড়িয়ে পড়েছে। ছড়িয়ে পড়েছে বৃত্তি, পাপড়ি কিছু কিছু। কোনো ছোটো কিট-পতঙ্গ এসবের মুল কারন। এখানে অনেক সুগন্ধি ফুলের গাছ আছে যার গন্ধে মন প্রাণ ভরে যায়। ডঃ আঙ্কেল সময় পেলেই মেঘ কে (মেঘা) এখানে নিয়ে আসেন। জিগ্গেস করেন – মেঘ কত ধরনের ফুল ফুটেছে, ফুলের সুবাস পেয়েছে। -আমি আর পারছিনা ডাক্তার সাহেব, আমার কোনো ইন্দ্রিয় কাজ করছে না সবই অচল । – প্লীজ প্লীজ মেঘ আত্মবল হাড়িও না। ডঃ আঙ্কেল দুঃখিত বোধ করে। কষ্ট পায় সে। সে কি তবে মেঘ কে আবার আগের মতো গড়ে তুলতে পারবেনা। মাঝে সাঝে সে নিজেই হ্যালোসিনেশনে ভোগে। এই বুঝি মেঘ এসে তাকে – আমি পেয়েছি, পেয়েছি ডঃ আঙ্কেল আমি ফুলের গন্ধ পেয়েছি । পূবাল হাওয়ায় খুব হেঁসেছি। এই ভাবে বলে আর তার জিবন থেকে সমস্ত মেঘ কেটে যায়। কিন্তু সেরকম কিছুই ঘটেনি দুপুর গড়ায় খোলা বারান্দায় গ্রিলের জানলার ফাঁক দিয়ে সূর্য রশ্মি ঢুকে যায় ঠিক যেন এক বছর আগে টেরিজা কলোনিতে রাত দশটায় অনুষ্ঠিত যাত্রা পালার মঞ্চে ফোকাস লাইটের মতো কোথাও ছোটো কোথাও বড়ো ইওলো আলোর ফোকাস। মেঘ বসে থাকে দুপুরের নিশ্চুপ ব্যালকনিতে। তার মনে হয় এই বুঝি সেই আলোর ওপর কেউ এসে দাঁড়াবে আর সেই যাত্রা-পালার মতো দিনের আলোর ফোকাসে ডায়লগ আরাম্ভ করবে- মেঘ তোমার মতো এতো কেউ ভাবছেনা বিশ্বাস করো। সব ঠিক হয়ে যাবে ওই শহরের রাজপথ দেখে কষ্ট পাচ্ছো, যেটা পথিক হীন। ওই পথ ধরে ক্যাডবেরি আসতো, গ্রিটিংস কার্ড আসতো। ওই পথে তুমি ট্যাক্সি ধরেছো। ওই পথে বরফ ওয়ালা কে দাঁড়াতে বলেছো, তাই না। সব ঠিক হয়ে যাবে মেঘ । কিন্তু সেই গ্রিটিংস ওয়ালা , সেই রেড রোজ হাতে ভ্যালেন্টাইন্স ডে তে উইসকরনে ওয়ালা, এক দিওয়ানা কে । আবার ফিরে পাওয়া যাবে তো, দুচোখে দেখতে পাওয়া যাবে তো। মেঘা হঠাৎই বিষন্নতা কাটাতে দু হাতের তালুতে মুখ ঘষাঘষি করতে থাকে। তার বিরক্তি লাগে তখনই আলোর ফোকাস থেকে ডায়লগ বন্ধ নাটকের অভিনেতা উধাও। সুপারি গাছের কাছে কি যেন কাঁপে, কে যেন কাঁপে। পিউ এই পিউ। পিউ এর চমক লাগে – কে যেন ডাকলো । – এই পিউ এদিকে জানলার দিকে সুপারি গাছের দিকে। পিউ তাহলে ঠিকই ভেবেছিল কোনো মানুষ নিশ্চয় ছিল ওখানে। পিউ জানলার কাছে গেলো। আলো এসেছে আলো। পিউ বললো – কি হয়েছে এতো রাত পর্যন্ত কোথায় ছিলে। উম?। -আগে দরজা টা খোলো পিউ। পিউ দরজা খুলে দিল। ঘরে আলো প্রবেশ করলো। – বিশ্বাস করো পিউ আমি বুঝতে পারিনি পুলিশ রা এতো কড়াকড়ি হয়ে যাবে। – ছিঃ তোমার লজ্জা করে না, এতো বড়ো দামড়া ছেলে বিয়ে করেছো,দু দিন বাদে বাবা হবে। এখনো টিন এজের মতো সোশ্যাল মিডিয়ায় আজেবাজে গুজব খবর ছড়াও। আসলে এই তোমাকে ভালোবেসে বিয়ে করাটাই আমার ভুল হয়েছে। – মা কোথায় পিউ। – সে ঘুমিয়ে পড়েছে, পাড়ার ছেলেরা তোমাকে নিয়ে কিভাবে হাঁসাহাঁসি করছে সে সব কি তুমি বুঝতে পারছো, উম?। এমনিতেই বাড়ি থেকে বেরোতে পারছি না দম বন্ধ হয়ে আসছে । পার্লারে যেতে পারছি না তার ওপর তুমি পালিয়ে বেড়াচ্ছ। – আহ্ পিউ কি করবো বলো আমি কি জানতাম কেষ টা এতদূর গড়াবে। -মেঘ এর খবর শুনেছ। -না, কেন আবার কিছু বাড়াবাড়ি হলো নাকি?। – একবার দূর থেকে দেখে এসো পারলে। -আচ্ছা একবার যাওয়ার চেষ্টা করবো। শোনো মাকে বলে দিও চিন্তা করতে হবে না। আর আমার ফোন টা.. -আজ সকাল দশটার পর থেকে বন্ধ আছে। – এই তো আমি জানতাম তুমি সবই বঝো। ঠিক আছে এখন তবে চলি। পিউ অবাক হয়ে বললো। – সে কি কোথায় যাবে এতো রাতে?। – আ আরে আজকের রাত টা অন্তত রাজীম এর বাড়ি তে কাটায়,ফট করে পুলিশ ফুলিশ এসে গেলে বিপদ হবে। তুলে নিয়ে গিয়ে ধোলাই দেবে। – তাই বলে রাজীম দের বাড়িতে কেন। – ওদের বাড়িটায় ফাঁকা পাবো সবাই হসপিটালে ভর্তি আছে। পিউ অবাক আর ভয়ের সাথে বললো।- সত্যি তোমাকে দেখে আমার জাষ্ট হাঁসি লাগছে হাঁসি। – ওকে আমি যায়। কাল সকালে ক্লাবের কাউকে চুপি চুপি ফোন করে থানায় গিয়ে টাকা খাইয়ে আসবো। – ক্লাব, ক্যাফে এগুলো তো সব বন্ধ । – হুম কাল অব্দি খোলা ছিলো আর কালই ওদের পাল্লায় পড়ে এসব ঘটেছে। এখন সব বন্ধ। আসি। – সাবধানে যেও। তারপর সকাল হলো। পিউ এক কাপ চা নিয়ে বারান্দায় দাঁড়ালো দেখলো কয়েকটি কালো কাক বড্ড কা কা করে বেড়াচ্ছে পিউ এর বড়ো অসস্তি হতে লাগলো‌। বেলা সাড়ে দশটা বাজে গ্যালো।প্রতিবেশীর মুখে মুখে শুনলো রাজীম নাকি মারা গেছে। সে ছুটে গেল শাশুড়ির কাছে বললো- মা মা রাজীম দা নাকি মারা গেছে। – হ্যাঁ ওর রোগ টা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। কি অবস্থা হচ্ছে না জানি আরও কত জন মরে। পিউ কাঁদতে আরম্ভ করলো । সেই সময় আলো ঘরে এলো এসে দেখলো মা ও স্ত্রী একসাথে কাঁদতে বসেছে। পিউ বললো – রাজীম দা মারা গেছে আলো খবর পেয়েছ তো। – হুম , কেঁদোনা পিউ আমি থানায় যাচ্ছি । একবার রাজীম কে দেখে আসার চেষ্টা করবো‌। আমি আসছি ফোন টা খুলে দিলাম কোনো অসুবিধা হলে জানিও আমি আসছি।

টাকার জোরে পীঠে রুলের বাড়ি টা পড়লো না তবে পুলিশের বকনি শুনতে হয়েছে প্রচুর। আলোর সাথে আরও দু’জন বন্ধু ছিল। তারা এইবার মাস্ক ব্যবহার করলো । দেখতে গ্যালো অফিস কলিগ ও কলেজ ফ্রেন্ড রাজীম কে শেষ দেখা । ওরা কাঁদতে আরম্ভ করলো। আলোর বুকটা যেনো কোন আঁধারে তলিয়ে গেছে বাকি দু’জন ওকে সামলাতে পারছিলনা। আলো কাঁদো কাঁদো গলায় বলছিল- কত কম বয়সে ছেলে টা আমাদের কে পর করে চলে গ্যালো। খুব কাছের বন্ধু ছিল আ হা হা হা রাজীম যাস না ভাই। ওরা তিনজন দেখলো মৃত্যু অভিযান শুরু করেছে মানুষ একটা ভাইরাস প্রতিমুহূর্তে ছড়িয়ে পড়েছে শহরে। দেখলো একটার পর একটা লাশ বেরুচ্ছে হসপিটাল থেকে । তার মধ্যে থেকে দেশের বাইরে থেকে আসা মানুষের সংখ্যা বেশি। কিছু বয়স্ক দের সংখ্যা বেশি,একটা নির্দিষ্ট স্থানে তাদের সমাধিস্থ করা হচ্ছে। সরকার সাহেব একুশ দিনের কার্ফু জারি করেছেন।আলোর মনে পড়লো রাজীম এর তো বাইক অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল, তার ওপর কন্যাকুমারী থেকে আসা একটা ক্লাইন্ট মিটিং অ্যাক্সিডেন্টের পনেরো দিন পর তার দেহে রোগ ধরা পরলো। একদিন ক্লাইন্ট মিটিং সেরে রাজীম এর বাড়ি ফিরতে দেরি হয়। সবাই অফিস থেকে বেড়িয়ে যায় শুধু মেঘ ছিল রাজীমের সাথে। কারন তাদের মনে মনে মিলে গিয়েছিলো। প্রেম হয়ে গিয়েছিল। মেঘ এখন দিন কে ভাবে নিকষ কালো রাত কুড়ি দিন আগেকার রাতের অ্যাকসিডেন্ট মেঘ অসুস্থ হয়ে পড়ে। সে শুধু জানে রাজীম এর একটা পা নষ্ট হয়ে গেছে। তার জীবন থেকে সব রং মুছে গেছে তার সমস্ত ইন্দ্রিয় নষ্ট হয়ে গেছে। রাজীমের জীবনের ব্যথায় ব্যাথায়। সে এখনো খবর পায়নি রাজীম এর মৃত্যুর, মেঘ বার বার দেখছিল শূন্য জনপদ , ঘর বন্দি মানুষের হাহাকার। ফাঁকা রাস্তায় পুলিশ গাড়ী আর অ্যাম্বুলেন্স। বার বার মনে হয় তার এই ভাবে কষ্ট পাওয়ার থেকে আপেল কাটা ছুড়ি দিয়ে নিজেকে শেষ করে ফেলি। ডঃ আঙ্কেল তখন নিচের বাগানে বাবার সাথে বসে চায়ের আড্ডায়। এমন সময় মেঘ উত্তেজিত হয়ে উঠলো। গলায় যেন বিষম লাগে তার কাশতে আরাম্ভ করলো। চেয়ার থেকে উঠতে গিয়ে মেঝেতে পড়ে গ্যালো। নিজের মাথার চুল যেন নিজেই উপড়ে নিতে চায়। কাশতে কাশতে মুখ থেকে প্রায় ব্লাড বেরিয়ে এলো অল্প অল্প।

সাবান, সা্্যনিটাইজ করার পর ঘরে আলো এলো। রাজীম কে দেখলে?। পিউ জিগ্গেস করলো। –হুম অনেক দূর থেকে ।-হাত মুখ ধুয়েছো ভালো করে। হুম। খেয়ে নাও আলো । আমার খিদে নেই । – মনখারাপ করোনা চলো খাবে চলো, মায়ের খাওয়া হলো। – হ্যাঁ। আচ্ছা মেঘের কাছে গিয়েছিলে।- না ফোন করেছিলাম। – কেমন আছে। – ওর বোন ফোন রিসিভ করলো। তখন প্রায় বিকাল তিনটে বাজে।- কি বললো। বললাম- কিরে খবর কি। দিদি কেমন আছে।সে বললো- ভালো না দাদা অবস্থা খুব খারাপ আমাদের , মনে হয় দিদির বড়ো ধরনের রোগ হয়েছে। তারপর আন্টি বললেন- আলো গাড়ি আসছে আমাদের কোরানটাইনে থাকতে হবে।পিউ অবাক হয়ে বললো- তারমানে মেঘ এরও । – হুম । – আলো , ওর কিছু হবে না তো । সেদিন অ্যাক্সিডেন্টে কিন্তু মেঘও ছিলো। – হুম , তবে রাজীম এর মতো ও চোট পায়নি। কাজেই ওর খেত্রে ভয়ের কিছু নেই। একটু থেমে আলো আবার বললো। – আমি নিজের চোখ কে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না রাজীম কে দেখতে গিয়েছিলাম যখন। – অনেক লাশ দেখছিলে । তাই না। – হুম । মেঘে এর খবর টা শোনার পর কিছু ভালো লাগছে না পিউ। আমি ঘুমালাম, – খাবে না। – খীদে নেই পিউ। পরের দিন ঠিক রাত্রি দশটা । পুলিশ খবর জানতে পেরেছে আলো রাজীম এর অফিস কলিগ । ফ্যামিলি সহ আলোকে রাতারাতি নিয়ে যাওয়া হয় কোরেনটাইনে। এবং এখন প্রায়ই কলোনিতে কলোনিতে পুলিশের জিফ ঘোরা ফেরা করে। আসলে এরা একে ওপর কে খুবই পছন্দ করতো। এদের কাঁদাকাটি করার আর একটা কারণ হলো লাইক করা অর্থাৎ কোনাকুনি ভাবে। রাজীম কে পিউ এবং মেঘ কে আলো পছন্দ করতো। কিন্তু রাজীম আর মেঘ ছিলো এক একাকার। এই মহামারী তে সব শেষ সব।

পোষ্টটি কেমন লাগল?

মতামত দিতে আপনাকে অবশ্যই লগিন থাকতে হবে।

গড় মান 0 / 5. মোট মতামত 0

আপনিই প্রথম মতামত দিন।

আপনার ভালো লাগেনি শুনে দুঃখিত!

কিভাবে উন্নতি করা যায়?

কিভাবে আরও উন্নত করা যায়, সে সমন্ধে আপনার মতামত দিন।

মুক্তাঙ্গন

Author: মুক্তাঙ্গন

চিন্তা হোক উন্মুক্ত...

Leave a Reply